আক্রমণের মুখেও মাথা নত নয়: মহুয়া মৈত্র


 

লিখেছেন: মিলটন মণ্ডল, সম্পাদক, টিপিএফ বাংলা

বাংলার রাজনীতিতে আজ সবচেয়ে বড় সংকট মতভেদের নয়, সংকট হল সহ্যশক্তির। বিরোধিতা থাকবে, তর্ক থাকবে, রাজনৈতিক সংঘাতও থাকবে—এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক রূপ। কিন্তু যখন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের জবাব যুক্তি দিয়ে নয়, ডিম ছুড়ে, অপমান করে, ভয় দেখিয়ে দেওয়ার চেষ্টা হয়, তখন বুঝতে অসুবিধা থাকে না—সেখানে রাজনীতির ভাষা দুর্বল হয়েছে, আক্রমণের ভাষা শক্তিশালী হয়েছে।

নদীয়ার কালীগঞ্জে দলীয় কার্যালয়ে বৈঠক চলাকালীন কৃষ্ণনগরের সাংসদ মহুয়া মৈত্রকে লক্ষ্য করে ডিম ছোড়ার ঘটনা সেই অসুস্থ রাজনৈতিক সংস্কৃতিরই আরেকটি প্রকাশ। উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট—অপমান করা, চাপে ফেলা, ভয় দেখানো এবং রাজনৈতিক বার্তা দেওয়া যে, ভিন্ন স্বরকে আক্রমণ করে চুপ করিয়ে দেওয়া যায়। কিন্তু যারা এই পরিকল্পনা করেছিল, তারা হয়তো একটা জিনিস বুঝতে ভুল করেছে—সব মানুষকে ভয় দেখিয়ে থামানো যায় না।

মহুয়া মৈত্র সেই বিরল রাজনৈতিক চরিত্রদের একজন, যাঁরা প্রতিকূলতার মুখে অবস্থান বদলান না। সুবিধা বুঝে নীরব হয়ে যাওয়া, ক্ষমতার হাওয়া বুঝে অবস্থান পাল্টে ফেলা, অথবা নিরাপদ দূরত্বে সরে গিয়ে আত্মরক্ষার রাজনীতি করা—এই সময়ের বহু পরিচিত মুখের ভিড়ে মহুয়া মৈত্র ঠিক উল্টো ছবিটাই তুলে ধরেছেন। আক্রমণের মুখেও তিনি পিছিয়ে যাননি, মাথা নত করেননি, নিজের অবস্থান থেকেও সরেননি। এটাই তাঁকে আলাদা করে।

এখানে বিষয়টি কেবল একজন সাংসদের উপর হামলা বা অপমানের চেষ্টা নয়। বিষয়টি হল, রাজনীতিতে ভয় দেখিয়ে জায়গা দখল করার প্রবণতার বিরুদ্ধে কে দাঁড়াতে পারছেন। আজ যখন অনেকেই হিসেব কষে কথা বলেন, মেপে প্রতিবাদ করেন, আর চাপের মুখে সুবিধাজনক নীরবতা বেছে নেন, তখন মহুয়া মৈত্রর অবস্থান আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ সাহস মঞ্চে দাঁড়িয়ে বড় বড় কথা বলার নাম নয়; সাহস হল আক্রমণের মুখেও নিজের কণ্ঠস্বর অটুট রাখা।

মহুয়া মৈত্রকে নিয়ে রাজনৈতিক মতভেদ থাকতে পারে, তাঁর বক্তব্য নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু এটুকু অস্বীকার করার উপায় নেই—তিনি লড়াইয়ের ময়দান ছেড়ে পালানোর মানুষ নন। তাঁকে অপমান করার চেষ্টা হয়েছে, কিন্তু সেই অপমান তাঁকে ছোট করেনি; বরং যারা এই রাজনীতির আশ্রয় নিয়েছে, তাদের সংকীর্ণতাকেই প্রকাশ্যে এনে দিয়েছে।

আজকের দিনে তাই মহুয়া মৈত্রকে শুধু একজন সাংসদ হিসেবে নয়, প্রতিকূলতার মুখে অনড় এক রাজনৈতিক কণ্ঠ হিসেবেও দেখতে হয়। কারণ মাথা নত না করার সাহস, চাপে না ভাঙার মানসিকতা এবং বিশ্বাসে অটল থাকার শক্তিই শেষ পর্যন্ত একজন রাজনীতিককে আলাদা করে দেয়।


নবীনতর পূর্বতন

نموذج الاتصال